আরিফ আহমেদ,
বরিশাল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এ আন্দোলনের নেপথ্যে কয়েকজন শিক্ষকের উসকানি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রাথমিক শাখায় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কয়েকজন অভিভাবক। এ বিষয়ে তারাও তৃতীয় শ্রেণির পাঠদান পুনরায় চালুর দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
অভিভাবকদের দাবি, শিক্ষক সংকটের কারণে ২০২৫ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে তৃতীয় শ্রেণির পাঠদান বন্ধ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিও বন্ধ করা হবে বলে তারা জানতে পেরেছেন। তবে অভিভাবকেরা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখার পক্ষে। তাদের দাবি, আগের নিয়মে প্রাথমিক শাখার পাঠদান অব্যাহত রাখতে হবে।
এ নিয়ে অভিভাবকেরা বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিনের কাছেও তাদের দাবি তুলে ধরেন।
মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে বসিক প্রশাসক পুনরায় তৃতীয় শ্রেণি চালুর প্রক্রিয়া শুরু করতে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানান। এ সময় দুজন শিক্ষকসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী তার বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করেন বলে জানা গেছে। পরবর্তী সময়ে কয়েকজন শিক্ষকের প্রত্যক্ষ মদদে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রাথমিক শিক্ষা বন্ধের দাবিতে আন্দোলনে নামে বলে অভিযোগ অভিভাবকদের।
১২ অক্টোবর সোমবার সরেজমিন বরিশাল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ক্লাস বর্জন করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। আন্দোলনকারীরা জেলা প্রশাসক ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিতে লংমার্চের উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানা গেছে।
এসময় আন্দোলনরত কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এ আন্দোলনে যুক্ত রয়েছে। তাদের বক্তব্য, স্কুল পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানে মাত্র পাঁচজন স্থায়ী শিক্ষক রয়েছেন। বাকি ১৫ জন অতিথি শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের আশঙ্কা, প্রাথমিক শাখার জন্য অতিথি শিক্ষক নিয়োগ করা হলে তাদের বেতনের চাপ শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ওপরই পড়তে পারে। এ আশঙ্কা থেকেই তারা প্রাথমিক শিক্ষা চালুর উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন বলে জানান।
আবার আন্দোলনকারীদের কয়েকজনের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ ডিগ্রি কলেজ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। তাই এখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় রাখা উচিত নয়। এ অবস্থানের সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষকও একমত বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সামনে আসেন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক তপন কুমার সাহা। তিনি বলেন, “এটি একটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সরকার থেকে যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে, সেটিই আমাদের পালন করতে হবে।”
অধ্যক্ষ জানান, প্রাথমিক শিক্ষা বন্ধের বিষয়টি সরকারি সিদ্ধান্ত নয়; এটি প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত। ২০২৫ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এর অংশ হিসেবে তৃতীয় শ্রেণির পাঠদান বন্ধ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিও বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিনের তৃতীয় শ্রেণি পুনরায় চালুর প্রস্তাবের বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, এটি বাস্তবায়ন করতে হলে একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। বিষয়টি সময়সাপেক্ষ। তিনি শিক্ষার্থীদেরও এ কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, শুধু প্রস্তাব দিলেই কোনো কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে চালু করা সম্ভব নয়। তারপরও শিক্ষার্থীরা কেন আন্দোলন করছে, তা তার বোধগম্য নয়।
অধ্যাপক তপন কুমার সাহা আরও বলেন, শিক্ষকসংকট ও শিক্ষকদের বেতনের বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পদাধিকার বলে বরিশালের জেলা প্রশাসক প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক কাউন্সিলের সভাপতি। এ বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
অন্যদিকে, একাডেমিক কাউন্সিলের সভাপতি ও বরিশালের জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার জানিয়েছেন, মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী তার কাছে প্রাথমিক শিক্ষা বন্ধের বিষয়ে একটি স্মারকলিপি দিয়েছে। সেখানে তৃতীয় শ্রেণি বন্ধ ও চালুর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক শিক্ষা বন্ধের দাবি জানিয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, “একাডেমিক কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবে কে বা কারা তৃতীয় শ্রেণি বন্ধ করল, আবার কে চালু করতে চাইছে, এর কিছুই আমার বোধগম্য হচ্ছে না। আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। আগে পুরো বিষয়টি জেনে নিতে হবে। এরপর পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।”
এদিকে, প্রাথমিক শাখায় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কয়েকজন অভিভাবক জানিয়েছেন, তৃতীয় শ্রেণির পাঠদান পুনরায় চালুর দাবিতে তারা জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, প্রাথমিক শিক্ষা বন্ধের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পেছনে কয়েকজন শিক্ষকের ভূমিকা রয়েছে। তারাই মডেল স্কুল এন্ড কলেজ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা বন্ধ করতে শিক্ষার্থীদের দিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলেছে বলেও অভিযোগ করেন।
এতে করে এখানে একটি গভীর ষড়যন্ত্র ক্রমশ ডালপালা ছড়াচ্ছে। কেননা, প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত, তৃতীয় শ্রেণির পাঠদান বন্ধের প্রক্রিয়া এবং পুনরায় চালুর বিষয়ে একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা গেছে। অধ্যক্ষ জানিয়েছেন, প্রাথমিক শিক্ষা বন্ধের বিষয়টি একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে, একাডেমিক কাউন্সিলের সভাপতি বলেছেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না এবং বিস্তারিত জেনে পরবর্তী বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভালো শিক্ষা পেতে অবিভাবকরা সবসময় তার সন্তান নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। মডেল স্কুল এন্ড কলেজ প্রাথমিক শিক্ষা বন্ধ করলে এটিকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে অন্যান্য স্কুল এন্ড কলেজেও প্রাথমিক শিক্ষা বন্ধ হবার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায়না।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮