প্রিন্ট এর তারিখঃ জানুয়ারী ১৮, ২০২৬, ১০:১৫ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জানুয়ারী ১৮, ২০২৬, ৬:৪৪ পি.এম
কক্সবাজারে স্বামীর দাপটে অফিস করেন না তানজিনা!

কক্সবাজার অফিস:
এতিম ও দুস্থ শিশুদের আশ্রয়ের শেষ ঠিকানা সরকারি শিশু পরিবার। কিন্তু কক্সবাজার সমাজসেবা কার্যালয়ের অধীনস্থ খরুলিয়ার সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা) যেন ব্যক্তিগত ইচ্ছায় পরিচালিত হচ্ছে। এখানকার উপ-তত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিন মাসের অধিকাংশ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। দীর্ঘ চার মাসের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তানজিনা আফরিন মাসে মাত্র ৩ থেকে ৪ দিন অফিসে আসেন এবং অবস্থান করেন বড়জোর ৩০ থেকে ৬০ মিনিট।
অভিযোগ উঠেছে, তাঁর স্বামী কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নিজাম উদ্দীন আহমেদ জেলা প্রশাসনের উচ্চপদে থাকায় ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন তানজিনা। গত সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সরেজমিনে অন্তত ২০ বার ওই কার্যালয়ে গিয়েও তানজিনা আফরিনের দেখা পাওয়া যায়নি।
হাজিরা খাতা ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি সপ্তাহে একদিনও নিয়মিত অফিস করেন না। মাঝেমধ্যে বিকেল ৫টার পর ব্যক্তিগত গাড়িতে করে এসে কিছু সময়ের জন্য সই-স্বাক্ষরেরকাজ সেরে আবার বেরিয়ে যান। প্রতিবেদক বারবার তাঁর সাথে দেখা করার চেষ্টা করলেও তিনি 'শিশুদের জন্য বাজার করছেন' এমন অযুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে গেছেন। পরে জানা যায়, দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তিনি শিখিয়ে দিয়েছেন যাতে কেউ তাঁর খোঁজ করলে 'বাজারের কাজে বাইরে আছেন' বলে জানানো হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারী জানান, তানজিনা আফরিন যোগদানের পর থেকেই এই অনিয়ম নিয়মে পরিণত হয়েছে। কেউ কিছু বললে তিনি দাম্ভিকতার সুরে বলেন, 'মানুষের ৩০-৩৫ বছর চাকরি করে যে অভিজ্ঞতা হয়, আমার তার চেয়ে বেশি আছে। সুতরাং আমার নিয়মিত অফিস করার দরকার নেই।'
এমনকি সমাজসেবা কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে অবগত থাকলেও এডিসি নিজাম উদ্দীনের রোষানলে পড়ার ভয়ে কেউ ব্যবস্থা নিতে সাহস পাচ্ছেন না।
জানা গেছে, একবার অনুপস্থিতি নিয়ে কথা বললে এডিসি নিজাম উদ্দীন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন। সরকারি শিশু পরিবারে ১০০ জন বালিকার বরাদ্দ থাকলেও বর্তমানে রয়েছে ৯৫ জন। প্রত্যেকের জন্য মাসে খাবার বাবদ ৪ হাজার এবং শিক্ষা উপকরণের জন্য ১ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকে। এছাড়া বিভিন্ন এনজিও থেকেও নিয়মিত বড় অংকের অনুদান আসে।
অভিযোগ রয়েছে, এই বিশাল অংকের অর্থের সঠিক হিসাব রাখা হয় না। নিয়ম অনুযায়ী ৬-৯বছর বয়সী এতিম ও অতি অসচ্ছল বালিকাদের ভর্তির কথা থাকলেও, বাস্তবে সচ্ছল ও বাবা-মা জীবিত আছে এমন শিশুদেরও এখানে ভর্তি রাখা হয়েছে।
সূত্র বলছে, এনজিওর অনুদান দিয়েই অনেক খরচ চালানো হলেও সরকারি বরাদ্দের বড় একটি অংশ তছরুপ হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপ-তত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিন দাবি করেন, তিনি প্রায়শই দাপ্তরিক কাজ 'বাসায় বসে' সম্পাদন করেন এবং বাকি সময় হোস্টেলের বাজার ও মিটিংয়ের কাজে ব্যস্ত থাকায় তাঁকে কার্যালয়ে পাওয়া যায় না।
তবে সরেজমিনে তাঁর এই দাবির কোনো সত্যতা মেলেনি; বরং অনুসন্ধানে দেখা গেছে তিনি মাঝেমধ্যে কেবল বিকেল ৫টার পর নামমাত্র সময়ের জন্য দপ্তরে আসেন। তাঁর এই রহস্যজনক অনুপস্থিতির বিষয়ে বক্তব্য নিতে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে একাধিকবার সরাসরি ও মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সুকৌশলে তা এড়িয়ে গেছেন: এমনকি পূর্বনির্ধারিত শিডিউল অনুযায়ী তাঁর আমন্ত্রণে দপ্তরে গিয়েও তাঁকে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম জানান, সরকারি শিশু পরিবারের হোস্টেলগুলোতে সপ্তাহে ৭ দিনই কর্মঘণ্টা নির্ধারিত। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কর্মস্থলে থাকা বাধ্যতামূলক। এর ব্যত্যয় ঘটা সরকারি বিধি-নিষেধ অমান্য করার শামিল।
অন্যদিকে, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক মো. সফি উদ্দিন বলেন, 'একজন উপ-তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব অত্যন্ত সংবেদনশীল। কেউ যদি মাসে মাত্র ৪-৫দিন অফিস করেন, তবে সেটি গুরুতর অপরাধ। আমরা এই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি বিধি-অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেব।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, কোড নাম্বারঃ ৯২