মো: মোসাদ্দেক হোসেন,
ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের শেষের দিকের কলকাতার কথা, তৎকালীন বঙ্গীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির গগন হিন্দু আধিপত্যের নিশ্ছিদ্র মেঘে ঢাকা। শ্যামাসংগীত ও কীর্তনের একচেটিয়া রাজত্বে মুসলিম জীবনাচার, বিশ্বাস, রীতি, নীতি সব একপ্রকার যেন অবাঞ্ছিত, অবহেলিত ও কোণঠাসা হয়ে উঠেছিল। সাহিত্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শেকড় গেড়েছিল বর্ণবাদী বা হিন্দুত্ববাদী আভিজাত্যের দম্ভ ও প্রচ্ছন্ন মুসলিম-বিদ্বেষ, এ সময়টাতে বাংলার মুসলমান সমাজ নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক চরম সংকটে নিপাতিত হচ্ছিল। সাহিত্যের চিরায়ত বর্ণিল আসরে তাদের প্রবেশাধিকার ছিল যেন অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ। অন্যদিকে,এই অবরুদ্ধ সমাজের ধর্মান্ধ ও কূপমণ্ডূক কিছু মুসলিমের দলও পিছিয়ে ছিল না। তারা অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে 'কুফরি' আখ্যা দিতে হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। আপন সম্প্রদায়ের এই বিদ্বেষাচরণ ও পরধর্মের সাহিত্যে দখলদারিত্বের এই দ্বিমুখী খড়গের নিচেই দণ্ডায়মান ছিলেন মুসলিম বিদ্রোহী চিত্তের কবি, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এরকমই একটি বৈরী ও তমসাচ্ছন্ন প্রেক্ষাপটে, সকল সাহিত্যিক আধিপত্য ও ধর্মান্ধতার শৃঙ্খল চূর্ণ করে নজরুলের কলম থেকে বাংলার মুসলিম সাংস্কৃতির আকাশে ধূমকেতুর মতো উদিত হলো প্রথম ইসলামী সংগীত "ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ"। তার এই অমর সৃষ্টি কেবল বাংলা সংগীতে ইসলামী ধারারই উন্মোচন করেনি; বরং বর্ণবাদী আগ্রাসন, পরধর্মের আধিপত্য ও স্বজাতির ধর্মান্ধতার গালে চপেটাঘাত করে ঘুমন্ত মুসলিম সাংস্কৃতিক সমাজের পুনর্জাগরণের এক ঐতিহাসিক দমামা বাজিয়ে ছিল। নজরুল তাঁর এই কালজয়ী সৃষ্টির মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে চেপে বসা সাংস্কৃতিক বঞ্চনার জবাব দিয়েছিলেন।
চলুন জানি নজরুলের এই অমর শিল্পকর্মের নৈপথ্যকথা।
সুরসম্রাট আব্বাসউদ্দীন তাঁর নিজ আত্মজীবনী - 'দিনলিপি ও আমার শিল্পী জীবনের কথা' তে লিখছেন এ বিষয়ে,
শ্যামা সংগীতের প্রবল জোয়ারে তখন মুসলিম শিল্পীরাও নিজেদের পরিচয় গোপন করে হিন্দু নাম ধারণ করে গান গাইতে বাধ্য হচ্ছিলেন। মুনশী মোহাম্মদ কাসেম হচ্ছিলেন কে. মল্লিক, তালাত মাহমুদ হচ্ছিলেন তপন কুমার কারণ মুসলিম নামে হিন্দু সংগীত গাইলে গান চলবে না। এসময়টাতে নজরুল নিজেও শ্যামা সংগীত লিখতেন, সুর দিতেন। ঠিক এমন সংকটময় মুহূর্তে একদিন নজরুলের পথ আটকে দাঁড়ালেন সুরসম্রাট আব্বাসউদ্দীন। আব্বাসউদ্দীন নজরুলকে খুব সম্মান করতেন ও সমীহ করে নজরুলকে তিনি কাজীদা বলে ডাকতেন। তাঁর বিনীত আবদার, যেহেতু সমসাময়িক উর্দু কাওয়ালি ব্যাপকভাবে বিক্রি হচ্ছে তাই উর্দু কাওয়ালির আদলে বাংলায় ইসলামী গান রচনা করে দিক কাজীদা, যা বাংলার মুসলমানদের ঘরে ঘরে গানের এক নব জোয়ার তুলবে।
সমসাময়িক পরিস্থিতি বিবেচনায় নজরুল পুরোটা রাজি না হলেও অসম্মতি দিলেন না কারণ তাঁর আবেগ মিশে আছে এই মুসলিম শব্দটার সাথে। ছোটবেলায় তিনি মক্তবে শিখেছেন ইসলামের পাঠ। তাঁর নামের সাথেও ইসলাম রেখেছেন। নজরুল বললেন, আগে দেখো ভগবতী বাবুকে রাজি করাতে পারো কিনা। গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল-ইন-চার্জ ভগবতী বাবু প্রচলিত স্রোতের বাইরে গিয়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ গানে বিনিয়োগ করতে নারাজ। কিন্তু আব্বাসউদ্দীনের টানা ছয় মাসের নাছোড়বান্দা অনুরোধের পর ভগবতী বাবু নিছক একটি এক্সপেরিমেন্ট হিসেবে একটি গান রেকর্ডের অনুমতি দেন। আব্বাসউদ্দীনের খুশিতে চোখে পানি আসার উপক্রম! যাক, সবাই রাজি। এবার তাহলে মুসলিমদের জন্য একটা গান নিয়ে আসা যাবে।
আব্বাসউদ্দীন জানতেন নজরুল চা আর পান পছন্দ করেন। এক ঠোঙা পান আর চা নিয়ে তিনি নজরুলের রুমে গেলেন। পান মুখে নজরুল খাতা-কলম হাতে নিয়ে একটা রুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আব্বাসউদ্দীন অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। মাত্র আধাঘণ্টার রুদ্ধদ্বার সাধনা শেষে বেরিয়ে এলেন নজরুল। তাঁর হাতের কাগজটিতে প্রথম দেখা মিলল সেই ঐতিহাসিক অমরকীর্তির "ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ; তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।" আবেগে আপ্লূত হয়ে চোখে পানি চলে এলো আব্বাসউদ্দীনের। গান লেখার চারদিনের মধ্যে গানের রেকর্ডিং শুরু হয়ে গেল। আব্বাসউদ্দীন জীবনে এর আগে কখনো ইসলামী গান রেকর্ড করেননি। গানটি তাঁর মুখস্তও হয়নি এখনো। গানটা চলবে কিনা এই নিয়ে গ্রামোফোন কোম্পানি শঙ্কায় আছে। রেকর্ডিংয়ের সময় স্বয়ং নজরুল হারমোনিয়ামের ওপর কাগজ ধরে আব্বাসউদ্দীনকে সুর তুলে দিয়েছিলেন।
এরপর রোজা পেরিয়ে ঈদ এলো। গ্রামে ঈদ করে কলকাতায় ফিরলেন আব্বাসউদ্দীন। কলকাতায় এসে তিনি দেখলেন এক অভাবনীয় দৃশ্য। ট্রামে, মাঠে, পথে-ঘাটে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে এই গান! অল্প দিনেই হাজার হাজার রেকর্ড বিক্রি হলো। যে ভগবতী বাবু একসময় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, তিনিই সানন্দে আরও ইসলামী গানের তাগিদ দিলেন।
এই অকল্পনীয় সাফল্য তৎকালীন কলকাতার গতানুগতিক সংগীতাঙ্গনের স্রোত সম্পূর্ণ উল্টে দিল। একসময় মুসলিম লেখক, গায়ক, সাহিত্যিক হিন্দু নাম নিত, আর এবার ধীরেন দাস, গিরিন চক্রবর্তীদের মতো হিন্দু শিল্পীরা ইসলামী গান গাওয়ার জন্য গণি মিয়া, সোনা মিয়া নাম ধারণ করতে শুরু করলেন। এরপর থেকে ক্রমান্বয়ে নজরুলের অবিনাশী কলম থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্ম নিতে থাকল "হে নামাজী", "ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ" এর মতো অসংখ্য অমর গজল ও নাতে রাসূল; যা প্রায় শতাব্দী পেরিয়ে আজও বাঙালির হৃদয়ে সমহিমায় অম্লান।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮