প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ১০, ২০২৬, ৬:৫০ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ অগাস্ট ১৯, ২০২৫, ৭:০৭ পি.এম

তৌহিদ বেলাল, কক্সবাজার:
সরকার আসে আর যায়, কিন্তু দেশে সাংবাদিক নির্যাতনের কোনো বিচার হয়না। খুন, গুম, হামলা, মামলা, আটক গ্রেফতারে জড়িত অপরাধীরা কিছুতেই গণমাধ্যমের সাংবাদিক ও সম্পাদকদের সহ্যই করতে পারেন না। ফলে মেজর সিনহা হত্যামামলায় ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি বহিস্কৃত খুনি ওসি প্রদীপ কুমার দাসের হাতে অমানবিক নির্যাতনের শিকার, নির্যাতিত সম্পাদক ফরিদুল মোস্তফা খান এখনো পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
রয়েছেন জীবনের চরম নিরাপত্তাহীনতায়।
মামলার খরচ চালাতে চালাতে তিনি এখন নিঃস্ব। রাষ্ট্রীয় আইনজীবী এবং মানবিক সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়াতো দূরের কথা, তাঁর মামলা নিষ্পত্তি, জানমালের নিরাপত্তা, আটকে রাখা পাসপোর্ট উদ্ধারে এই পর্যন্ত এগিয়ে আসননি কোন মানবতার ফেরিওয়ালা।
প্রায় ৬ বছর আগে জামিনে কারামুক্তির পর এবং এর আগে পরিবারের পক্ষ থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর, ডিসি, এসপিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে আবেদন-নিবেদন করা হলেও রহস্যজনক কারণে তা ঝুলে আছে।
সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা, রাষ্ট্রপতি, তথ্য মন্ত্রনালয়, আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জেলা প্রশাসনের আন্তরিক হস্তক্ষেপ এবং মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করা হলেও আবেদনের রিসিভ কপি ছাড়া নির্যাতিত সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা এই পর্যন্ত কোনো প্রতিকার পাননি।
প্রত্যাহার হয়নি ৬ মামলার একটিও।
এই অবস্থায় আবেদনের রিসিভ কপি আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া এই মুহূর্তেে নির্যাতিত ফরিদুল মোস্তফার আর কিছুই নেই বললেই চলে। তিনি বলছেন, মামলার বোঝা সইতে পারছেননা আর। কষ্টেের মাত্রা সীমাহীন হয়ে পড়ছে। আর্থিক দৈন্যদশার কারণে ফরিদুল মোস্তফা ও তার পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন।
জানা যায়, 'বাংলাদেশে বিচার বহির্ভুত মানুষ হত্যা, উখিয়া টেকনাফের সাবেক এমপি, মাদকের গডফাদর আবদু রহমান বদি, ওসি প্রদীপ এবং তার লালিত মাদক ও ঘুষ সিন্ডিকেটের মাদক নির্মুলের নামে নিজেদের মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে টাকা না দিলে ক্রসফায়ার দেন টেকনাফের ওসি প্রদীপ' শিরোনামে ২০১৯ সালে কয়েকটি বস্তুনিষ্ট সংবাদ প্রকাশ এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা কক্সবাজারের তৎকালীন পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন সিন্ডিকেটের রোষানলে পড়েন।
ফলে সেই সময়ে মিথ্যা মামলা থেকে রেহাই পেতে সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সাথে দেখা করে জীবনের নিরাপত্তার আবেদন করেন এই নির্যাতিত সাংবাদিক। কিন্তু দুর্ভাগ্য, জুলুম-নির্যাতন ও হয়রানি থেকে রেহাই পাওয়া তো দূরের কথা, ফরিদুল মোস্তফাকে বিনা ওয়ারেন্টে উল্টো ঢাকা থেকে ওসি প্রদীপের টেকনাফ থানা পুলিশ তুলে এনে ২০১৯ সালে কয়েকদিন পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির ৬টি সাজানো মামলা দিয়ে চালান দেন আদালতে। আবেদন করেন রিমান্ডেরও।
এইসব মামলায় তিনি টানা ১১ মাস ৫ দিন কারাভোগ করে জামিনে মুক্ত হন। ওই সময় আদালতে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করা হলেও রহস্যজনক কারণে চার্জ গঠিত হয়।
পরবর্তীতে অবশ্য এই ঘটনায় কক্সবাজারের সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মোঃ ইসমাইল বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফার উপর ঘটে যাওয়া ওসি প্রদীপের জুলুমের কথা উল্লেখ করে সহমর্মিতা প্রকাশ, নিজের সীমাবদ্ধতা এবং তার মিথ্যা মামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন। এই অবস্থায় দায়েরকৃত ৬ মিথ্যা মামলা গত ৬ বছর হয়ে গেলেও প্রত্যাহার হয়নি।
সাজানো মামলায় দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে এসে প্রদীপ গংয়ের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন ফরিদুল মোস্তফা। অথচ, তার ফৌজদারি মামলাটি রেকর্ড হয়নি আজও। আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে গত ৫ বছর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন- পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বারবার সময়ের দরখাস্ত দিয়ে সময় ক্ষেপন করায় নির্যাতিত সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফার আইনজীবীরা পুলিশের পরিবর্তে মামলাটি বিচারবিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে আমলে নেওয়ার আবেদন করলে তাও কার্যকর হয়নি।
একই সাথে ফরিদুল মোস্তফার সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, থানার রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা, সিডিএমএস সংশোধন ও জীবনের নিরাপত্তার দাবিতে তার স্ত্রীর দায়েরকৃত হাইকোর্টে রিট আবেদনটি নিষ্পত্তি হয়নি গত ৬ বছরেও। কেন তার জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া হবেনা- মর্মে স্বরাষ্ট্র সচিব, কক্সবাজারের ডিসি-এসপিসহ বিবাদীদের রুলেই আটকে আছে রিট পিটিশন।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন- পিবিআইকে এ ঘটনার ৪ সপ্তাহের ভেতরে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও রহস্যজনক কারণে গত ৬ বছর ধরে হাইকোর্টে
ওই প্রতিবেদনটি জমা না দিয়ে আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে।
শুধু তাই নয়, নির্যাতিত সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তার নামে পূর্বের ইস্যুকৃত ডিজিটাল পাসপোর্টটি মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় নবায়নের আবেদন করলেও পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের অজুহাতে পাসপোর্টটি স্থগিত করে দেন পাসপোর্ট মহাপরিচালকের পক্ষে এক কর্মকর্তা।
অথচ ডিজিটাল পাসপোর্ট নবায়নের ক্ষেত্রে পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদনের প্রয়োজন নেই মর্মে পাসপোর্ট ডেলিভারি স্লিপ দিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের কারণে টানা ৫ বছর পাসপোর্ট নবায়ন করে না দেওয়া দুর্বলের উপর সবলের জুলুম বলে মনে করছেন ফরিদুল মোস্তফার স্বজনেরা।
এই অবস্থায় নির্যাতিত সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা ও তার পরিবার মামলা প্রত্যাহার, পাসপোর্ট ফিরিয়ে পাওয়া, থানার রেকর্ডপত্র সিডিএমএস সংশোধন, পরিবারের জানমালের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তা পেতে প্রধান উপদেষ্টা, আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট, পুলিশ সদর দপ্তর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আদালত, উচ্চ আদালত, সকল গোয়েন্দা সংস্থা, পাসপোর্ট সদর দপ্তর, মহাপরিচালক পাসপোর্ট অ্যান্ড ইমিগ্রিশন, দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন আবারও।
ফরিদুল মোস্তফা একজন পেশাদার কারা নির্যাতিত মজলুম সাংবাদিক।
দুই যুগের অধিককাল ধরে তিনি বাংলাদেশ বেতারসহ জাতীয়, স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি কক্সবাজার থেকে প্রকাশিত দৈনিক কক্সবাজারবাণী পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। পেশাগত রোষানলের শিকার ও লেখালেখির অপরাধে নিঃস্ব ফরিদুল মোস্তফা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও ন্যায় বিচারের দাবিতে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন এখনো। মামলাগুলো প্রত্যাহারূা মিথ্যা মামলায় আদালতের মুল্যবান সময় যেমন নষ্ট হচ্ছে অন্য দিকে একজন পেশাদার সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফার পরিবার হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
সাংবাদিক ফরিদের অভিযোগ, ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত, বরখাস্ত ওসি প্রদীপের ৬ মিথ্যা অভিযোগে দায়েরকৃত মামলাগুলো প্রত্যাহার চেয়ে গত ৬ বছর আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বাংলাদেশ অনলাইন সংবাদপত্র সম্পাদক পরিষদও আবেদন করেছে। মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম-বিএমএসএফসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন ও সাংবাদিক নেতারা এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্নস্থানে বিক্ষোভ এবং মানববন্ধন হয়েছে বহুবার।
বহুল আলোচিত এসব সাজানো মামলায় মাসে মাসে ধার্য্য তারিখে কক্সবাজার আদালতে হাজিরা দিতে দিতে তিনি এখন ক্লান্তশ্রান্ত বলেও জানান।
এছাড়া ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তৎকালীন সময়ে দায়েরকৃত তার মামলাটি আমলে নিয়ে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান ভুক্তভোগী এবং সাংবাদিক সমাজ।