আরিফ আহমেদ,
বরিশাল সদর উপজেলার চাঁদপুরা ইউনিয়নের তালুকদার হাটে একটি সাইনবোর্ড আর একটি শাখা পোস্ট অফিস যেন দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ভুল স্থানে স্থাপিত ‘স্বাগতম বাকেরগঞ্জ উপজেলা’ লেখা সাইনবোর্ড সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পরও সেটি যথাস্থানে রয়ে গেছে। অন্যদিকে, জরাজীর্ণ পোস্ট অফিস ভবনের দেয়াল থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা, দেয়াল ও মেঝের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে বারবার বিষয়টি জানানো হয়েছে, এ নিয়ে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু দৃশ্যমান সমাধান না হওয়ায় স্থানীয়দের দুর্ভোগ ও উদ্বেগ কাটছে না।
সরেজমিনে দেখা যায়, তালুকদার হাটের পোস্ট অফিসের সামনেই সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ‘স্বাগতম বাকেরগঞ্জ উপজেলা’ লেখা সাইনবোর্ডটি। এটি নিয়ে ইতিমধ্যেই সীমানা বিরোধ তৈরি হয়ে গেছে। ওপারের বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়নের সঠিখোলা ইউনিয়নের বাসিন্দারা বলতে শুরু করেছেন, এখানেই আগে আমাদের সীমানা ছিলো, তাইতো এই সাইনবোর্ড এখানে বসেছে। গুগল ম্যাপও এখন এই সাইনবোর্ডকে বাকেরগঞ্জ সীমানা হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করেছে। অথচ স্থানটি বরিশাল সদর উপজেলার চাঁদপুরা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। সাইনবোর্ডটির অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠলেও কার্যকর সমাধান আজ পর্যন্ত হয়নি। অথচ ইতিপূর্বেই দুই উপজেলার নির্বাহী ও ভূমি কর্মকর্তারা এটি পরিদর্শন করেছেন এবং ভুল সীমানায় সাইনবোর্ড বসানো হয়েছে স্বীকার করে তা দ্রুত অপসারণের জন্য জেলা পরিষদে নোটিশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সদর উপজেলার ভূমি কর্মকর্তা আজহারুল ইসলাম। এরপর গত ২৭ সেপ্টেম্বর বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বরিশাল জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমান সাইনবোর্ডটি সরিয়ে সঠিক স্থানে স্থাপনের নির্দেশ দেন। সঠিক স্থান নির্ধারণ করা সম্ভব না হলে সেটি পুরোপুরি অপসারণের নির্দেশও দেন তিনি। কিন্তু নির্দেশ দেওয়ার পরও সাইনবোর্ডটি সরানো হয়নি বলে জানা গেছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা সমস্যাটির সমাধান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এটি কেবল একটি সাইনবোর্ডের অবস্থানগত সমস্যা নয়; সরকারি দপ্তরের নির্দেশ বাস্তবায়নের বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশের পরও যদি একটি দৃশ্যমান সমস্যা আগের অবস্থায় থেকে যায়, তাহলে সেই নির্দেশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার এবং কেন তা কার্যকর হচ্ছে না, এ প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
অন্যদিকে, তালুকদার হাট শাখা পোস্ট অফিসের অবস্থা আরও উদ্বেগজনক। ২০০৬ সালে নির্মিত ভবনটির বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়ছে। দেয়াল ও মেঝের বিভিন্ন অংশে ক্ষয় ও খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। ভবনটির এমন অবস্থা ডাকসেবা নিতে আসা মানুষ এবং সেখানে দায়িত্ব পালনকারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভবনটির ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা নিয়ে বহুবার সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পরও কার্যকর সংস্কার বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে একই সমস্যার মধ্যে চলছে পোস্ট অফিসের কার্যক্রম।
একটি পোস্ট অফিস কেবল চিঠিপত্র আদান-প্রদানের জায়গা নয়। এখানে রয়েছে ই সেবা কার্যক্রমও। তাই সাধারণ মানুষের বিভিন্ন ডাকসেবা গ্রহণের পাশাপাশি কম্পিউটার রিলেটেড সেবাসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবাকেন্দ্র এটি। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের ভবন যদি জরাজীর্ণ অবস্থায় থাকে, তাহলে কর্মীদের কর্মপরিবেশের পাশাপাশি সেবা নিতে আসা মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তালুকদার হাট শাখা পোস্ট অফিসের জায়গাটি স্থানীয় তালুকদার বাড়ি থেকে দেওয়া হয়েছে। এখানে ভবন নির্মাণের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ার অভিযোগ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ভবনটি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, জরুরি সংস্কারে কী পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন এবং সংস্কার সম্ভব না হলে বিকল্প ব্যবস্থা কী হতে পারে, এসব বিষয়ে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের সরেজমিন পরিদর্শন ও কারিগরি মূল্যায়ন প্রয়োজন।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সাইনবোর্ডের অবস্থান নিয়ে আগেও প্রশাসনিক পর্যায়ে পদক্ষেপের কথা এসেছে। পোস্ট অফিসের ভবন নিয়েও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ, সমস্যাগুলো সংশ্লিষ্টদের নজরে আনার চেষ্টা নতুন নয়। তারপরও দৃশ্যমান সমাধান না হওয়ায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে- সমস্যা চিহ্নিত হওয়ার পরও সমাধানের উদ্যোগ কেন দীর্ঘায়িত হচ্ছে?
এ বিষয়ে জানতে জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমানকে ফোন করা হলে তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে জানান। অন্যদিকে ফোন রিসিভ করেন নাই বরিশাল অঞ্চলের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল নাঈম ইবনে রহমান।
সাইনবোর্ডটি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ বাস্তবায়নে জেলা পরিষদের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে পোস্ট অফিস ভবনের বর্তমান অবস্থা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংস্কার, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ কিংবা বিকল্প ভবনের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব ডাক বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। দুটি সমস্যার ধরন আলাদা হলেও উভয় ক্ষেত্রেই প্রয়োজন দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ।
তালুকদার হাট তথা চাঁদপুরা ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের এখন একটাই প্রত্যাশা, বিষয় দুটি আর সংবাদ প্রকাশ ও নির্দেশ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সমস্যার স্থায়ী সমাধানে এগিয়ে আসবেন। সাইনবোর্ডটি সঠিক স্থানে স্থাপন অথবা অপসারণ এবং পোস্ট অফিস ভবনটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে এটাই তাদের প্রত্যাশা।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮