
সালমান রশিদ, শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়:
২০২৬ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে সামরিক হামলার মধ্য দিয়ে যে সংঘাতের সূচনা, তা দ্রুতই বিস্তৃত হয়ে আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। এই উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে—যে পথ দিয়ে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি পরিবাহিত হয়। গাল্ফ অঞ্চলের তেলক্ষেত্র, শোধনাগার ও বন্দরে ধারাবাহিক হামলার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এরই প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ থেকে ১২১ ডলারে পৌঁছেছে, যা পরিস্থিতি অবনতির ক্ষেত্রে ১৫০ ডলারও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এই বৈশ্বিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আমদানি-নির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর, যার বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে বর্তমান সংকট অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করছে।
জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট
বাংলাদেশে বছরে গড়ে ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি করা হয়, যা কিছু ক্ষেত্রে ১২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ১০ ডলার বাড়লে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায় প্রায় ৮০ থেকে ৯০ কোটি ডলার। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই ব্যয় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, লোডশেডিং, শিল্প উৎপাদনে স্থবিরতা এবং সার সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দিচ্ছে। ইতোমধ্যে একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা বন্ধ থাকায় কৃষি খাতেও চাপ বাড়ছে, যা খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করছে।
প্রবৃদ্ধি হ্রাস ও দারিদ্র্যের ঝুঁকি
অর্থনৈতিক এই অস্থিরতার প্রভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪.৬ শতাংশ থেকে ৩.৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই হার আরও ১.২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে এবং ৬ লাখ পর্যন্ত কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি ০.৫ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে।
রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ
বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, বিশেষ করে সৌদি আরব থেকে। গাল্ফ অঞ্চলের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রবাসী কর্মীদের আয় ও কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়তে পারে, যার ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানিতে শিপিং ব্যয়, যুদ্ধঝুঁকি বিমা প্রিমিয়াম ও রুট জটিলতার কারণে ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে এবং টাকার অবমূল্যায়নের ঝুঁকি বাড়ছে।
উত্তরণের কৌশল: স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ জরুরি
বর্তমান সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে—বিশেষ করে জ্বালানি নির্ভরতা, সীমিত রিজার্ভ এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ও সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রথমত, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্যকরণও গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি, লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি এবং রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিশ্চিত করাও সমানভাবে জরুরি।
তৃতীয়ত, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স খাতকে সুরক্ষিত রাখতে লজিস্টিক খরচ কমানো, কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার।
চতুর্থত, একটি সমন্বিত জাতীয় অর্থনৈতিক সংকট ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা উচিত, যাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়।
উপসংহার
বর্তমান সংঘাত দ্রুত নিরসন হলে এর প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। তবে দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকি তৈরি হবে। ইতোমধ্যে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন আরও দ্রুত, সাহসী ও কাঠামোগত সংস্কার। এই সংকট যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল ও সহনশীল করে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও বটে।
























