আন্তর্জাতিক ডেস্ক,
ইরানের সঙ্গে মাসের পর মাস ধরে চলা যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন।
তাদের আশঙ্কা, বর্তমান হারে অস্ত্রের মজুত কমতে থাকলে ওয়াশিংটন একই সময়ে আরেকটি বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে সামরিক সক্ষমতার ওপর বড় চাপ তৈরি হতে পারে।
অস্ত্রের ঘাটতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে ইউরোপ ও এশিয়া থেকে সামরিক সরঞ্জাম এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নিয়েছে পেন্টাগন। একই সঙ্গে কয়েকটি মিত্র দেশের কাছে নির্ধারিত কিছু অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র হাজার হাজার ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্ভুল নিশানাভেদী অস্ত্র ব্যবহার করেছে। ফলে ইউরোপ ও এশিয়ায় মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর জন্য রাখা মজুত থেকেও অস্ত্র সরিয়ে নিতে হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ১ হাজার ৫০০টিরও বেশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। বর্তমানে দেশটির হাতে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ১ হাজার ৭০০টিরও কম বলে দাবি করা হয়েছে।
উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যবহৃত বিপুলসংখ্যক প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণ করতে দুই বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে।
প্যাট্রিয়ট যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ায় মোতায়েন মার্কিন বাহিনী এবং মিত্রদের সুরক্ষায় এর ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে।
অস্ত্রের ঘাটতির কারণে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এশিয়া ও ইউরোপে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ১২টি প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি রয়েছে। এর মধ্যে PAC-2 এবং PAC-3—দুই ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। এসব ইউনিট THAAD এবং দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব Cheongung-II-এর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করে।
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে এশিয়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
পেন্টাগন এশিয়া থেকে কিছু আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতার পাশাপাশি কৌশলগত নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কিছু সম্পদও মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তর করেছে।
এতে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে কোরীয় উপদ্বীপে মার্কিন বাহিনী আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শুধু প্যাট্রিয়ট নয়, ATACMS এবং PrSM-এর মতো দূরপাল্লার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক ব্যবহারের ফলে কমে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত হলে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বড় পরিমাণ গোলাবারুদ ও নির্ভুল নিশানাভেদী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হতে পারে। বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত হলে অস্ত্রের চাহিদা অনেক বেড়ে যেতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে রাশিয়া ও চীন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, মস্কো ও বেইজিং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ব্যবহারের গতি ও পরিমাণ নিজেদের সামরিক পরিকল্পনায় বিবেচনায় নিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে ইউরোপ ও এশিয়ায় মার্কিন প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হলে রাশিয়া ও চীনের সামনে ওয়াশিংটনের সামরিক প্রতিশ্রুতি পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অস্ত্রের মজুত দ্রুত পূরণ করতে প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোকেও উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে পেন্টাগন।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্টিভ ফেইনবার্গ প্রতিরক্ষা শিল্পের নির্বাহীদের কাছে পাঠানো এক স্মারকে সর্বোচ্চ ২১ দিনের মধ্যে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিস্তারিত পরিকল্পনা জমা দিতে বলেছেন।
কোম্পানিগুলোকে আরও দ্রুত এবং আগ্রাসী সরবরাহ সময়সূচি গ্রহণের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর এই উদ্যোগের মধ্যেই কংগ্রেসে ১ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যয় বিল আটকে রয়েছে। ফলে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনাও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ওপর চাপ তৈরি করেনি, বরং ইউরোপ ও এশিয়ায় ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—একদিকে বর্তমান সামরিক অবস্থান ও মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত পুনর্গঠন করা।
কারণ আরেকটি বড় সংঘাত শুরু হলে বর্তমানের মতো অস্ত্র সংকট যেন মার্কিন সামরিক সক্ষমতাকে নতুন করে চাপে না ফেলে—সেটিই এখন ওয়াশিংটনের অন্যতম বড় উদ্বেগ।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮