
তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল, বিশেষ প্রতিনিধি
লালমনিরহাট সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর ইউনিয়নের মনোরম গ্রামের শিক্ষিত যুবক জাহিদ হাসান বসুনিয়া। গত ৬ বছর ধরে যে জমিতে তিনি আলু বা অন্যান্য অর্থকরী ফসল উৎপাদন করতেন। সেই জমিতে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে স্ট্রবেরি চাষ শুরু করেন। যদিও এই এলাকার মাটি ও আবহাওয়া স্ট্রবেরি চাষের জন্য অনুকূল নয় কিন্তু ব্যতিক্রমী কিছু করে সফল হওয়ার স্বপ্নে বিভোর জাহিদের অদম্য সাহস ও মনোবলের কারণে পিছপা হননি।
যুবক জাহিদ ও স্থানীয়রা জানান, জাহিদ ২০১৮ সালে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। সরকারি চাকুরি পেতে অনেক চেষ্টা,তদবির ও অর্থ ব্যয় করতো হতো তাই তিনি চাকুরির আশা ছেড়ে কৃষিকাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। পৈতৃক সূত্রে জাহিদ পেয়েছিলেন ১ একর জমি। সেখানে তিনি আলুর আবাদ শুরু করেন। আলু চাষে লাভবান হওয়ায় পরপর ৪ মৌসুম তিনি আলুর আবাদ করেন। কিন্তু ভিন্ন কিছু করার একটি স্পৃহা তার মনের কোনে উঁকি দেয়। তার সেই ইচ্ছে পূরণে তিনি ইউটিউব ও গুগোল থেকে স্ট্রবেরি চাষের পদ্ধতি জানতে পেরে মনস্থির করেন। ছুটে যান বগুড়ার হাসান নামে এক স্ট্রবেরি চাষির কাছে। তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে জমি প্রস্তুত করেন যুবক জাহিদ। প্রথমে সঞ্চয়ের ২ লাখ টাকায় শুরু করেন স্ট্রবেরি চাষ। কিন্তু পুঁজির সংকটের কারণে বাণিজ্যিকভাবে স্ট্রবেরি চাষ করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন তিনি। অপরদিকে স্থানীয় ব্যাংকগুলো ঝুঁকি রয়েছে এমন আবাদে ঋণ দিতে রাজি হয় নি। উপায়ন্তর না দেখে ৩টি এনজিও থেকে ৪ লাখ টাকা ঋণ করেন জাহিদ। আর ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো ৩ বিঘা আলু চাষের জমিতে রোপণ করেন ১৮ হাজার স্ট্রবেরির চারা।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২ মাসের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি চারা মরে যায়। কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি। অবশিষ্ট প্রায় ৮ হাজার চারাগাছের যত্ন নেয়া শুরু করেন জাহিদ। নিয়োগকৃত শ্রমিকদের পরিচর্যা আর নিজের প্রচেষ্টায় আড়াই মাসের মাথায় গাছে থোকায় থোকায় ফল আসতে শুরু করে। শুরু হয় একটি নতুন অধ্যায়।
যুবক জাহিদ বলেন, “এ বছর আমি দুইদিনে প্রায় ৭০ কেজি স্ট্রবেরি বিক্রি করেছি। প্রতি কেজি ফল পাইকারি মূল্য ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা। রংপুর, কুড়িগ্রাম ও জেলা সদরের অনেকেই স্ট্রবেরী কিনতে আসছেন। আমি সম্পূর্ণ অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ করি তাই আমার ফল নেয়ার ক্ষেত্রে অনেকেই আগ্রহ দেখায়। আগামী ১মাস আমার গাছগুলো থেকে নিয়মিতভাবে ফল পাবো। যদি গাছের বাড়তি যত্ন নিই এবং উপরে ছায়ার জন্য একটি শেড তৈরি করে দিতে পারি তাহলে আরও ২ মাস ফল পাওয়া যাবে। আর তাই আমি ফলগুলো বিক্রির ক্ষেত্রে কিছু পন্থা অবলম্বন করি। যেমন রক্তের মতো লাল রঙের ফলের ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করি। ক্রেতারা ওই ছবি দেখে আকৃষ্ট হয়। ফলে তারা আমার সাথে যোগাযোগ করেন। এরপর থেকে তারা আমার সাথে ব্যবসা ও লেনদেন শুরু করেন। আমার স্বপ্ন বাগানটাকে আরও বড় করা। তাহলে আরও লাভবান হবো বলে আশাকরি।“
জাহিদ জানান, গত ২ বছর তিনি প্রতি মৌসুমে খরচ বাদে ৫-৬ লাখ টাকা আয় করেছেন। এবার তার আয় বাড়বে বলে আশা করেন। আর লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতা পেলে আগামীর দিনগুলোতে ফলন বৃদ্ধিসহ চাহিদা আরো বৃদ্ধি করতে সক্ষম হবেন তিনি।
প্রতিবেশী বেলাল বলেন, “ প্রতিদিনই স্ট্রবেরি ক্ষেত দেখতে দূরদূরান্ত থেকে অনেকেই আসেন। আমাদের এলাকার অনেকেই জাহিদের এই উদ্যোগ দেখে স্ট্রবেরি চাষে আগ্রহ প্রকাশ করছেন”
জেলা শহর থেকে আসা ফারুক সূর্য নামে এক যুবক বলেন, “জাহিদ ভাইয়ের স্ট্রবেরি চাষের কথা শুনে তাজা স্ট্রবেরি দেখতে এসেছি। এ অঞ্চলে সাধারণত এই ফলের চাষ হয় না। গাছে টাটকা স্ট্রবেরি দেখে ভাল লাগছে। আশাকরি আমি সাধ্যের মধ্যে অল্প কিছু কিনবো।“
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক -শস্য- সৈয়দা সিফাত জাহান বলেন, “অনেকে সখের বশে স্ট্রবেরি চাষ করে থাকে। স্ট্রবেরি একটি সংবেদনশীল ফল তাই খুব অল্প সময়ের জন্য তাজা থাকে। বাণিজ্যিকভাবে এই ফলের চাষ ও বাজারজাতকরণ একটা বড় চ্যালেঞ্জ। উদ্যোক্তা জাহিদ, সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সফল হয়েছেন জেনে খুশী হয়েছি। প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজন হলে কৃষি বিভাগ থেকে তা করা হবে।“
স্বপ্নবাজ যুবক জাহিদ আশা করেন তিনি স্ট্রবেরি চাষের পরিধি বাড়াবেন ও আরও লাভবান হবেন। তার এই স্বপ্ন পূরণ হোক এই প্রত্যাশা।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮