আরিফ আহমেদ,
বাস শ্রমিকদের দাবি, ইজিবাইক ও অটোরিকশা চলবে শাখা সড়কে, বাস চলাচলের মূল সড়কে নয়। অন্যদিকে ইজিবাইক চালকদের প্রশ্ন, শাখা সড়কই যদি না থাকে, তাহলে তারা চলবেন কোথায়? জীবিকার তাগিদে তাদেরও তো যাত্রী বহন করতে হবে। দুই পক্ষের এমন পাল্টাপাল্টি দাবি ও বিরোধে গত দুদিন ধরে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন বরিশাল সদর উপজেলার চরকাউয়া বাস টার্মিনালের অভ্যন্তরীণ সাতটি রুটের প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। এসব রুটের ওপর নির্ভরশীল পটুয়াখালীর বাউফল ও গলাচিপা উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন ও বাকেরগঞ্জ উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন এবং বরিশাল সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের বাসিন্দারা। বাস ও ছোট যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তিন উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদের মানুষ।
গত ৩১ অক্টোবর রাতে ইজিবাইক চালকদের মারধর ও যানবাহন ভাঙচুরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে চরকাউয়া বাস টার্মিনাল থেকে গোমা, ডিসিঘাট, মাতবর হাট, কাটাদিয়া, নেহালগঞ্জ ও লাহারহাট সড়কে বাস চলাচল বন্ধ করে দেন বাস শ্রমিকরা। একই সঙ্গে পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে থ্রি-হুইলার, ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিকল্প পরিবহন সংকটে পড়েছেন এসব এলাকার সাধারণ মানুষ।
সরেজমিনে ২ নভেম্বর সোমবারও এই ধর্মঘট চলমান দেখা গেছে। চরকাউয়া বাস টার্মিনাল এলাকায় বাস মালিক সমিতির সভাপতি মামুন খন্দকার, শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাসুম মজুমদার এবং ইজিবাইক ও অটোরিকশা চালকদের পক্ষে বাকেরগঞ্জ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান চুন্নু সিকদারসহ সংশ্লিষ্টদের বৈঠক চলছিল। তবে বৈঠক চললেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কোনো অবসান হয়নি এবং সমস্যারও সমাধান হয়নি।
টার্মিনাল এলাকায় নারী-পুরুষ, শিক্ষার্থী, বয়োবৃদ্ধসহ অসংখ্য যাত্রীকে যানবাহনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে অনেক যাত্রী নিজেদের দুর্ভোগ ও ক্ষোভের কথা তুলে ধরেন। তাদের অভিযোগ, বাস ও ছোট যানবাহন বন্ধ থাকার সুযোগে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালকরা নির্ধারিত ভাড়ার দ্বিগুণ দাবি করছেন। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দাঁড়িয়াল, দুধল, মাতবর হাট, গোমা ও ডিসিঘাট এলাকার মানুষ। জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত, চিকিৎসাসেবা গ্রহণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে তাদের জন্য।
চরকাউয়া বাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাসুম মজুমদার জানান, গত শনিবার রাতে চরকাউয়া বাস টার্মিনালে বাস শ্রমিকদের সঙ্গে থ্রি-হুইলার ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের বিরোধ বাধে। এ সময় সড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল বন্ধের দাবি জানান বাস মালিক ও শ্রমিকরা। তার দাবি, থ্রি-হুইলারের কারণে প্রতিনিয়ত বাস দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এসব যানবাহন চলাচল করায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। এতে সাধারণ যাত্রীরা নিহত ও আহত হচ্ছেন। পাশাপাশি দুর্ঘটনায় একটি বাস ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি পুনরায় সড়কে নামাতে মালিককে মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার সমাধান চাওয়া হলেও কার্যকর উদ্যোগ না পাওয়ায় তারা ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ছোট যানবাহনগুলোকে শাখা সড়ক ব্যবহারের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট প্রত্যাহার করবেন না বলেও জানান তিনি।
চরকাউয়া বাস মালিক সমিতির সভাপতি মামুন খন্দকার বলেন, বাসের ক্ষতি হলে একজন মালিকই বোঝেন সেই ক্ষতির পরিমাণ। এটি শুধু শ্রমিকদের নয়, বাস মালিকদেরও দাবি। দ্রুত সময়ের মধ্যে মূল সড়ক থেকে থ্রি-হুইলারসহ ছোট যানবাহন সরিয়ে নিতে হবে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার জেরে থ্রি-হুইলার ও অটোরিকশা চালকরা সংগঠিত হয়ে বিভিন্ন স্থানে গাছ ফেলে বাস চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছেন। বাসের চালক ও হেলপারদের মারধরের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার বিচার দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে ইজিবাইক চালকদের বক্তব্য, বিকল্প সড়ক বা নির্ধারিত শাখা সড়কের ব্যবস্থা না করে তাদের মূল সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি বাস্তবসম্মত নয়। তাদের পক্ষ থেকে সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে বাস মালিক সমিতির কার্যালয়ে আলোচনা চলার সময় চরামদ্দির ইজিবাইক চালক সুমন সিকদার বলেন, গোমা থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত ইজিবাইক চলাচল করে। কিন্তু এই সড়কের কোথাও তাদের চলাচলের জন্য আলাদা সাইড সড়ক নেই। ফলে বাসের সঙ্গে একই সড়ক ব্যবহার করেই যাত্রী পরিবহন করতে হয়। অথচ সামান্য কোনো সমস্যা হলেই বাস মালিক ও শ্রমিকরা তাদের সাইড সড়কে চলে যেতে বলেন। অনেক সময় যানবাহনের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে।
সুমন সিকদার আরও বলেন, চরকাউয়া খেয়াঘাট পর্যন্ত ইজিবাইক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সে অনুযায়ী তারা জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত চলাচল করেন। তবে কখনো অসুস্থ রোগী থাকলে রোগী ও স্বজনদের অনুরোধে বাস টার্মিনাল পর্যন্ত যেতে হয়। গত শনিবার অসুস্থ রোগী নিয়ে চরকাউয়া খেয়াঘাট পর্যন্ত যাওয়াকে কেন্দ্র করেই তাদের একজন চালককে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে বাস মালিক ও শ্রমিকদের বাধার মুখে চলাচল করতে হচ্ছে দাবি করে সুষ্ঠু সমাধান না হওয়া পর্যন্ত চরকাউয়া ইউনিয়নে কোনো যানবাহন চলতে দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
চরকাউয়ার পরিবহন সংকট ও যাত্রী ভোগান্তির ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ২০২২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে এই বাস টার্মিনাল। সেখানে দেখা যায়, চরকাউয়ার সাতটি রুটে বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়ার দেড় থেকে দ্বিগুণ আদায়ের অভিযোগে যাত্রীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছিলেন। চরকাউয়া থেকে গোমা, লাহারহাট, কাটাদিয়া, নেহালগঞ্জ, ডিসিরোড, হলতা ও চরকাউয়া থেকে টুমচর বা মাতবর হাট এই সাতটি রুটে দীর্ঘদিন ধরে বাস চলাচল করছিল। ওই সময় চরকাউয়া-গোমা রুটে ১৫ কিলোমিটার পথে বিআরটিএ নির্ধারিত ৩৩ টাকার পরিবর্তে ৫০ টাকা এবং চরকাউয়া- ডিসরোডে নির্ধারিত ৫০ টাকার পরিবর্তে ৯০ টাকা আদায়ের অভিযোগ ওঠে। শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়া, যাত্রী হয়রানি বন্ধ, ফিটনেসবিহীন বাস অপসারণ ও লাইসেন্সধারী চালক নিয়োগসহ ছয় দফা দাবিতে জেলা প্রশাসক ও বিআরটিএর কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছিলেন যাত্রীরা।
এর পরদিনই, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, মালিক সমিতির নেতারা সাতটি রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে যাত্রীদের জিম্মি করেন এবং তাদের নির্ধারিত ভাড়া বহাল রাখেন। ঐ সময় সকাল ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা বাস চলাচল বন্ধ ছিল। মালিক সমিতির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল, অবৈধ ছোট যানবাহনের কারণে বাসে যাত্রী কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি গোমা ফেরিঘাটে বাসপ্রতি অতিরিক্ত মাশুল আদায়ের অভিযোগও তোলা হয়েছিল। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও বিআরটিএ কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে আলোচনার আশ্বাস পেয়ে সেদিন বিকেলে বাস চলাচল শুরু হয়। বর্তমানে গোমা ব্রীজ হয়েছে এবং সেখানে কোনো টোল দিতে হয়না, তারপরও ডিসরোড পর্যন্ত ৯০ টাকাই ভাড়া বহাল রয়েছে।
এর আগেও ২০২২ সালের ৭ জুলাই অবৈধভাবে বাস পরিচালনা নিয়ে বিরোধের জেরে চরকাউয়া থেকে বরিশাল ও বাকেরগঞ্জের অভ্যন্তরীণ সাতটি রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়েছিল। সকাল সাড়ে ৯টার পর বন্ধ হওয়া বাস চলাচল প্রায় চার ঘণ্টা পর সমঝোতার আশ্বাসে স্বাভাবিক হয়। অর্থাৎ ২০২২ সালেই কয়েক মাসের ব্যবধানে একাধিকবার পরিবহন অচলাবস্থায় পড়েছিল চরকাউয়ার এই জনপদ। সর্বশেষ চলতি বছরের ২ আগস্টও বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও নির্বাচন নিয়ে বিরোধের জেরে একই টার্মিনালে বাস ধর্মঘট শুরু হয়। প্রায় ৩০০ শ্রমিকের আন্দোলনে পাঁচ-ছয়টি রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিকল্প যানবাহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও ওঠে। পরে সংসদ সদস্য আইনজীবী মজিবর রহমান সরোয়ারের হস্তক্ষেপে প্রায় ৪৬ ঘণ্টা পর ৪ আগস্ট বাস চলাচল স্বাভাবিক হয়। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে একই টার্মিনালে আবারও পরিবহনে অচলাবস্থা তৈরি হলো।
অর্থাৎ কখনো অতিরিক্ত ভাড়া, কখনো মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ, কখনো ছোট যানবাহনের চলাচলের বিভিন্ন কারণ সামনে এলেও এর চূড়ান্ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের। বছরের পর বছর ধরে এসব সমস্যা চললেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। এবারের পরিস্থিতি নিরসনেও বরিশাল-৫ আসনের সংসদ সদস্য আইনজীবী মজিবর রহমান সরোয়ার এবং জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। তবে সোমবার বিকেল পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। স্থানীয় পর্যায়ে দুই পক্ষের আলোচনা চললেও সাধারণ মানুষের যাতায়াত স্বাভাবিক করার কোনো নিশ্চয়তা এখনো পাওয়া যায়নি।
বাস মালিক ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা, দুর্ঘটনা রোধ এবং ইজিবাইক চালকদের জীবিকার প্রশ্ন- দুই পক্ষেরই বক্তব্য ও দাবি রয়েছে। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না করে শুধু নিষেধাজ্ঞা কিংবা পাল্টাপাল্টি ধর্মঘটের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সড়কের ধারণক্ষমতা, যানবাহনের সংখ্যা ও চলাচলের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নির্ধারিত রুট, শাখা সড়ক, স্টপেজ এবং যানবাহন নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা। প্রায় ৬০ হাজার মানুষের যাতায়াতের ওপর নির্ভরশীল এই জনপদে পরিবহন নিয়ে এমন অচলাবস্থা কোনোভাবেই কেবল শ্রমিকদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে বাস ও ছোট যানবাহনের চলাচল স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান জরুরি। অন্যথায় মালিক-শ্রমিকদের বিরোধের বলি হয়ে বারবার সাধারণ মানুষকেই জিম্মি থাকতে হবে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮