প্রিন্ট এর তারিখঃ এপ্রিল ৮, ২০২৬, ৭:০৩ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ এপ্রিল ৮, ২০২৬, ১:০৮ পি.এম
আবারও চবির শাটলে পাথর হামলা: শিক্ষার্থী নয়, এবার রক্তাক্ত অভিভাবক

সজল চন্দ্র রায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের প্রধান বাহন ও প্রাণের স্পন্দন হিসেবে পরিচিত শাটল ট্রেন এখন এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের চরম অব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাহীনতার কারণে আবারও রক্ত ঝরার ঘটনা ঘটল। তবে এবার কোনো শিক্ষার্থী নয়, দুর্বৃত্তদের ছোড়া পাথরের আঘাতে গুরুতর জখম হয়েছেন ক্যাম্পাসে আসার পথে এক অভিভাবক।
গত মঙ্গলবার বিকেলে ক্যাম্পাসমুখী শাটল ট্রেনটি যখন ঝাউতলা এলাকা অতিক্রম করছিল, তখন বাইরে থেকে ছোড়া একটি ধারালো পাথর জানালার গ্রিল ভেদ করে সরাসরি ওই ব্যক্তির চোখের ওপর আঘাত করে। এতে তিনি প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ নিয়ে শাটলের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। আহত ওই ব্যক্তি চবিতে অধ্যয়নরত এক শিক্ষার্থীর বড় ভাই, যিনি তার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে ক্যাম্পাসে আসছিলেন।
পাথরটি সামান্য এদিক-সেদিক হলে চোখের অপূরণীয় ক্ষতি বা প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল। একজন অভিভাবক যখন তার ভাইয়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অনিরাপদ হিসেবে প্রত্যক্ষ করেন এবং সেখানে এসে রক্তাক্ত হন, তখন তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। ভাইয়ের ক্যাম্পাসকে নিরাপদ মনে করে ঘুরতে এসে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হওয়া ওই অভিভাবক এবং তার পরিবার এখন কতটা আতঙ্কিত হবেন, তা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
এর আগে গত ২৭ জানুয়ারি ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় একইভাবে পাথরের আঘাতে এক ছাত্রীর মুখমণ্ডল ক্ষতবিস্থত হয়েছিল। কিন্তু একের পর এক এমন ঘটনার পরও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রেল পুলিশ বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো বিশেষ টহল বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না।
শাটলের এই সংকট কেবল নিরাপত্তাহীনতায় সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসহনীয় শিডিউল বিপর্যয় ও যান্ত্রিক ত্রুটি। মঙ্গলবার দুপুর ২টার ট্রেনটি ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় এবং দীর্ঘ ক্রসিংয়ের কারণে নির্ধারিত সময়ের প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা পর গন্তব্যে পৌঁছায়। এতে শত শত শিক্ষার্থী চরম ভোগান্তিতে পড়েন এবং অনেকেরই দূরপাল্লার বাস ও ট্রেনের যাত্রা বাতিল হয়ে যায়।
একদিকে বগির জানালায় পর্যাপ্ত সুরক্ষা নেই, অন্যদিকে শাটলের অধিকাংশ আসন দখল করে রাখে বহিরাগতরা। শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে বাধ্য হলেও বহিরাগতদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। ঝাউতলা ও আশপাশের এলাকায় নিয়মিত ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা, যার সর্বশেষ নজির দেখা গেছে গত ৬ এপ্রিল এক শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনতাইয়ের ঘটনায়।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত প্রশাসন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। দায়িত্বে থাকা উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার এ বিষয়ে কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত বা দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে পারেননি। পরবর্তীতে উপাচার্য পরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসনের কাছ থেকেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানো এবং শাটলের বগি আধুনিকায়নের দাবিগুলো এখনও ফাইলবন্দি। শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের রহস্যময় নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের নিজেদের অধিকার রক্ষার প্রধান মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) বর্তমানে সম্পূর্ণ অকার্যকর ও ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই সংকট সমাধানে চাকসুর কোনো শক্তিশালী উদ্যোগ বা জোরালো ভূমিকা না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং শাটলকে বহিরাগতমুক্ত করতে অতিদ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, কোড নাম্বারঃ ৯২