মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা
(এম এন লারমা)।।
জুম্ম জাতির চেতনার প্রতীক
এস চাঙমা সত্যজিৎ
বিশেষ প্রতিনিধিঃ
আজ শোকাবহ ১০ই নভেম্বর। ইতিহাসের স্মরণীয় বেদনাবিধুর ও কলঙ্কের কালিমায় কলুষিত বিভীষিকাময় এক ভয়ঙ্কর দিন। আজ অবিসংবাদিত মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকী ও জুম্ম জাতীয় শোক দিবস।
হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানিয়া সেই অচিন্তনীয় ১০ নভেম্বর বছর ঘুরে আবার এলো। আজকের এই দিনে বিনম্র শ্রদ্ধা, গভীর শোক আর ভালবাসায় ফুলে ফুলে সিক্ত হবে শহীদ বেদী। প্রতিবছর শহীদের স্মরণে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যে প্রভাতফেরী, পুষ্পস্তবক অর্পণ, স্মরণসভা, প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও ফানুস উড়ানোসহ নানা কর্মসূচী পালিত হয়।
সেই ’৮৩ মর্মান্তিক ট্রাজেডি জুম্ম জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। ১৯৮৩ সালের এই দিনে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলনের পথ প্রদর্শক, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তাঁর আটজন সহযোদ্ধাসহ বিভেদপন্থী, প্রতিক্রিয়াশীল, গিরি-প্রকাশ-দেবেন-পলাশ চক্রের বিশ্বাসঘাতকতামূলক অতর্কিত আক্রমণে শাহাদাৎ বরণ করেন। ঘাতকদের নির্মম বুলেটে খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার খেদারছড়া থুম এলাকা রক্তাক্ত হয়েছিল। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে বিভেদপন্থী, নরপিশাচ ঘাতকরা শুধু মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাসহ আটজন সহযোদ্ধাকে নির্মমভাবে হত্যা করে থেমে থাকেনি; তারা মেতে উঠেছিল অদম্য রক্ত পিপাসায়। প্রতিবছর ১০ই নভেম্বর আসে জুম্ম জাতির হৃদয়ে শোক আর কষ্টের দীর্ঘশ্বাস হয়ে।
এই শোকাবহ দিনে ’৮৩ ঘাতক বিভেদপন্থী, প্রতিক্রিয়াশীল, ক্ষমতালিপ্সু গিরি-প্রকাশ-দেবেন-পলাশ নামক দানবদের ঘৃণাভরে ধিক্কার জানাই। আজকের এই দিনে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি অকুতোভয় সকল বীর শহীদদের যাঁরা জুম্ম জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন।
শাসকগোষ্ঠীর রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে আপোসহীন আন্দোলন-সংগ্রামে শামিল হয়ে যাঁরা অবর্ণীয় নির্যাতন-নিপীড়ন, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন এবং পঙ্গুত্ব বরণ করে আজ দুর্বিষহ জীবন অতিবাহিত করছেন।
মৃত্যুর অমোঘ নিয়তিকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। জীবন-মৃত্যু চিরায়ত সত্য। মানুষের জীবন জন্ম ও মৃত্যু-শাসিত। কিন্তু এমন কিছু মৃত্যু; যা অনাকাঙ্খিত। যে মৃত্যু সবাইকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। যে মৃত্যুকে মেনে নিতে আমাদের কষ্ট হয়। কিন্তু এমন কিছু মানুষ আছে যাঁরা মৃত্যুর পরও তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে অমর হয়ে থাকে। তেমনি একজন পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি আমাদের অবিসংবাদিত মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। আজ এম এন লারমা আমাদের মাঝে নেই কিন্তু ঘাতকদের সাধ্য ছিল না ইতিহাসের পাতা থেকে তাঁকে মুছে ফেলা। ঘাতকরা জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামের জয়যাত্রাকে মাঝপথেই ধ্বংস করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র করেও ব্যর্থ হয়েছে। আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস লিখতে হলে, জুম্ম জাতির আন্দোলন-সংগ্রামের কথা লিখতে হলে মহান নেতা এমএন লারমার কথা অবশ্যই লিখতে হয়। কারণ তিনি ইতিহাসের সাথে মিশে আছেন। অপরদিকে এম এন লারমার খুনীরা আজ অপরাধীর কাড়গড়ায়! তারা আজ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ হয়েছে। ইতিহাস খুনিদের ক্ষমা করে নাই। জুম্ম জাতির ইতিহাসে তাদের নাম বিশ্বাসঘাতক, কুচক্রী, বিভেদপন্থী হিসেবে চিরদিন ঘৃণিত হয়ে থাকবে। জাতীয় সংসদ শোক প্রস্তাবেও মহান নেতা এমএন লারমার হত্যাকারী হিসেবে ‘বিভেদপন্থী গিরি-প্রকাশ-দেবেন-পলাশ চক্র’দের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে [ মৃত্যুর ৩৩ বছর পর এম এন লারমার প্রতি সংসদের শোক]
এম এন লারমার মৃত্যুর ৩৩ বছর পর সংসদে শোক প্রকাশ
পাঠ করা শোক প্রস্তাবে বলা হয়েছে, “এম এন লারমা ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার খেদারছড়ার থুম এলাকায় ‘বিভেদপন্থী গিরি-প্রকাশ-দেবেন-পলাশ চক্র’ নামের একটি সশস্ত্র গ্রুপের আক্রমণে নিহত হন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৪৪। স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে তিনি ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের এবং ১৯৭৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম-১ আসন থেকে জাতীয় সংসদের স্বতন্ত্র সদস্য নির্বাচিত হন।”
এম এন লারমা সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। তাঁর জীবন ও সংগ্রাম, নীতি-আদর্শ, চিন্তা-চেতনা, কর্মজীবন সম্পর্কে আমাদের জানা অবশ্যই প্রয়োজন । পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি তথ্য ও প্রচার বিভাগ থেকে প্রতি বছর ১০ই নভেম্বর স্মরণে প্রকাশনা প্রকাশিত করে থাকে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮