চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ আবদুর রহমানকে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিস থেকে জারি করা এক আদেশ নোটিশে জানানো হয়, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ইং তারিখ থেকে তিনি এই দায়িত্ব পালন করবেন।
আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়, ডিন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত অথবা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অধ্যাপক ড. মোঃ আবদুর রহমান উক্ত অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনি প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্য হবেন। আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলেও জানানো হয়েছে।
তবে তার এই দায়িত্বভার কে কেন্দ্র করে জুলাই বিপ্লবের চেতনায় উজ্জীবিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন, সাধারণ শিক্ষার্থী সহ বিশ্ববিদ্যালয়টির সংশ্লিষ্ট সচেতন ব্যক্তিত্বদের মাঝে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তথ্য রয়েছে, ২০১৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের দলীয় প্রভাবের কারণে অধ্যাপক ড. মোঃ আবদুর রহমানকে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন বলেও জানা গেছে।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও পদগুলো দলীয় ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও অনুগতদের মধ্যেই বণ্টন করা হতো। অধ্যাপক ড. মোঃ আবদুর রহমানও সেই ঘনিষ্ঠতার সূত্রে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের পরিচালকের মতো বড় দায়িত্ব বাগিয়ে নিয়েছেন বলে দাবি করছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় থাকা শিক্ষার্থীরা সহ অন্যান্য সচেতন মহল।
এছাড়াও, অধ্যাপক ড. মোঃ আবদুর রহমান আওয়ামীপন্থী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলেও প্রতিবাদ জানাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টির নানান ক্রিয়াশীল সংগঠন এবং জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। পূর্বে তিনি আওয়ামী পন্থী শিক্ষক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং ভিন্নমতের শিক্ষকদের ওপর নানা ধরনের প্রভাব খাটাতেন বলেও দাবি করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টির সাথে সংশ্লিষ্টরা।
সর্বোপরি, রক্তাক্ত জুলাই অভ্যুত্থানের পর একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তির দায়িত্ব গ্রহণকে মেনে নিতে পারছেন না অনেকেই। উল্লেখ্য, জুলাই অভ্যুত্থানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের দুইজন শিক্ষার্থী (শহীদ মো. ফরহাদ হোসেন ও শহীদ হৃদয় চন্দ্র তড়ুয়া) শহীদ হন।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে নতুন করে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এমন বাস্তবতায় একজন আওয়ামী ফ্যাসিস্টের দোসরকে অনুষদের শীর্ষ দায়িত্বে বসানো কতটা যৌক্তিক তা প্রশ্নবিদ্ধ। এছাড়াও অনেকেই বলেছেন, যদি এখনো আওয়ামী ফ্যাসিস্টের দোসররা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দখল করে নেন তাহলে জুলাই অভ্যুত্থানের মূল্য কোথায়!
এমতাবস্থায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল আমীন ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান চৌধুরীর স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ নিয়োগের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান হয়। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, অধ্যাপক ড. মোঃ আবদুর রহমান অতীতের স্বৈরশাসনের একজন সমর্থক ও আদর্শিক সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাদের দাবি, তাকে ডিন পদে নিয়োগ দেওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শিক দাপট আরও শক্তিশালী হবে এবং ভিন্নমত দমনের অপচেষ্টা সংহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়াও জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের পক্ষ থেকে এই নিয়োগ বাতিলের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে প্রশাসনিক পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, সততা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও মুক্ত পরিবেশ রক্ষায় সব ধরনের দলীয় ও মতাদর্শিক দখলদারিত্ব বন্ধ করার দাবিসহ তারা মোট তিনটি দাবি উত্থাপন করেন।
এ বিষয়ে রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমে জানান, ২০১৬ সালের পর তিনি সেখানে চাকরিতে আছেন কি না এ বিষয়ে সঠিক তথ্য আমার কাছে নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই না কোনো ফ্যাসিবাদী মানসিকতার কেউ দায়িত্বে থাকুক। তবে তিনি ফ্যাসিবাদী সমর্থক কি না, রেজিস্ট্রার হিসেবে আমি তা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।
এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. আবদুর রহমান গণমাধ্যমে জানান, আমি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর ছিলাম শিপিং কর্পোরেশনের। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন আমি কোনো দল করি কি না। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মক্ষেত্রেই ছিলাম, কোথাও যাইনি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান এ বিষয়ে বলেন, বর্তমান প্রশাসন কার্যত আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। তিনি জানান, ছাত্রদলের লক্ষ্য হলো ক্যাম্পাসসহ দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে আওয়ামী লীগের দোসরমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। এ দাবিতে তারা ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮