মোঃ হাচান আল মামুন ,খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি,
আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আধিপত্যের দ্বন্দ্ব, দফায় দফায় সড়ক অবরোধ ও গোলাগুলির ঘটনায় পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালি। পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণার পর একের পর এক বাতিল হচ্ছে রিসোর্ট-কটেজের আগাম বুকিং। এতে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের হিসাবে প্রতিদিন ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ১ কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত। ভরা পর্যটন মৌসুম শুরুর আগে এমন অচলাবস্থায় চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন রিসোর্টমালিক, কর্মচারী, পরিবহনশ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি টানা ১০ দিন চললে শুধু রিসোর্ট ও পরিবহন খাতেই ক্ষতি হতে পারে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবসার ক্ষতি যুক্ত হলে অঙ্কটি আরও বাড়বে। অন্যদিকে অবরোধের কারণে খাদ্যসামগ্রী পরিবহন, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যাহত হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
অবরোধ, গোলাগুলি ও পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন গত ১১ অক্টোবর থেকে সড়ক অবরোধ শুরু করে। তাদের তিন দফা দাবির একটি হলো জেএসএসের (সন্তু লারমা) পক্ষের সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়া। ওই দিনই জেলা প্রশাসন সাময়িকভাবে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করে।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ স্থগিত থাকায় পর্যটকদের জন্য সাজেক খুলে দেওয়া হয়েছিল। তবে ২২ অক্টোবর থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু হয়। এরপর জেলা প্রশাসন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
ওই দিন সাজেকে আটকে পড়া ২ হাজার ৯৩৩ জন পর্যটককে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) ভাষ্য অনুযায়ী, গঙ্গারাম বাজার এলাকায় পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়।
পুলিশের ভাষ্য, ইউপিডিএফ নেতাদের পরিকল্পনা ছিল নিরীহ পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জিম্মি করে সহিংসতা চালানো। তবে অবরোধকারীদের দাবি, তাঁদের ওপর হামলা হয়েছে এবং এতে শতাধিক সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন।
এদিকে ২৪ অক্টোবর ইউপিডিএফ-সমর্থিত ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদ খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে আধা বেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দেয়। বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান জানিয়েছেন, পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক রয়েছে।
১২০টির বেশি রিসোর্ট-কটেজ
সাজেকের পর্যটন ব্যবসার বড় অংশ গড়ে উঠেছে রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ ও পরিবহনকে ঘিরে। রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির হিসাবে, সেখানে প্রায় ১২০টি রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে তিন হাজারের বেশি পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা আছে। অন্য ব্যবসায়ীদের হিসাবে, রিসোর্ট ও কটেজের সংখ্যা ১১০ থেকে ১৩৫টির মধ্যে। পাশাপাশি রয়েছে ২০টির বেশি রেস্তোরাঁ।
ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় এক হাজার কর্মচারী ও ব্যবসায়ী সরাসরি পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া জিপ ও মাহিন্দ্রা চালক, পর্যটক গাইড, দোকানি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পরোক্ষভাবে এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ।
১০ দিনে ক্ষতি পাঁচ কোটি টাকা ছাড়ানোর আশঙ্কা
ব্যবসায়ীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সাজেকের ১৩৫টি রিসোর্টের ৬৭৫টি কক্ষ থেকে প্রতিদিন ন্যূনতম ভাড়া বাবদ আয় হতে পারে ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অন্যদিকে দৈনিক গড়ে ২০০টি গাড়ি চলাচল করলে পরিবহন খাতে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৬ লাখ টাকা।
এ হিসাবে ১০ দিন পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকলে শুধু রিসোর্ট ও পরিবহন খাতেই সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসার ক্ষতি যোগ করলে তা পাঁচ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে এসব হিসাব ব্যবসায়ীদের দেওয়া অনুমাননির্ভর; ক্ষয়ক্ষতির কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব পাওয়া যায়নি।
ব্যবসায়ীদের আরেকটি হিসাব অনুযায়ী, পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে ১ কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত। দুর্গাপূজার ছুটিতে ১৯ অক্টোবর থেকে রিসোর্টগুলোতে শতভাগ বুকিং ছিল বলে দাবি তাঁদের। পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব বুকিং বাতিল করতে হয়েছে এবং পর্যটকদের টাকা ফেরত দিতে হয়েছে।
সাজেক রুইলুই হলিডে রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী মিশু দে বলেন, তাঁর রিসোর্টের প্রায় ৬০ শতাংশ বুকিং বাতিল হয়েছে। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি।
এর আগেও অস্থিরতার কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন সাজেকের পর্যটন ব্যবসায়ীরা। ২০২৪ সালে এক মাস পর্যটক না আসায় রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতি পাঁচ থেকে আট কোটি টাকা ক্ষতির কথা জানিয়েছিল। সে সময় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীও চাকরি হারিয়েছিলেন।
জীবিকা নিয়ে শঙ্কায় স্থানীয় বাসিন্দারা
পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় শুধু রিসোর্টমালিকেরা নন, ক্ষতির মুখে পড়েছেন কর্মচারী, জিপ ও মাহিন্দ্রা চালক, রেস্তোরাঁ ও দোকানের মালিকেরাও। এর প্রভাব পড়ছে খাগড়াছড়ির পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসাতেও। খাগড়াছড়ি শহরের ৩০টির বেশি হোটেল-রিসোর্টের পাশাপাশি পরিবহন ও খাবারের ব্যবসায়ীরাও চাপে রয়েছেন।
সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা বলেন, সড়ক অবরোধের কারণে শুধু পর্যটক ও ব্যবসায়ীরা নন, স্থানীয় বাসিন্দারাও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কেনা এবং কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়ার কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
সাজেক হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক ইব্রাহিমের আশঙ্কা, অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে কয়েক হাজার পরিবারের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত অনেক পরিবার দৈনন্দিন খরচ মেটাতে হিমশিম খাবে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পর্যটন চালুর দাবি
সাজেকের কুঁড়েঘর রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী যতেন ত্রিপুরা বলেন, পাহাড়ের তিন জেলাতেই আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাত রয়েছে। কিন্তু অন্য কোথাও এভাবে সড়ক অবরোধের ডাক দেওয়া হয় না কেন, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
নভেম্বর থেকে সাজেকে ভরা পর্যটন মৌসুম শুরু হওয়ার কথা। এ সময় দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আগমন বাড়ে। কিন্তু মৌসুমের ঠিক আগে সৃষ্ট অচলাবস্থায় নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন উদ্যোক্তারা।
গত ২৩ অক্টোবর খাগড়াছড়িতে সাজেকের পর্যটন ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক, চালক ও স্থানীয় বাসিন্দারা বিক্ষোভ করেন। তাঁরা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়ার দাবি জানান। অন্যথায় খাগড়াছড়ি অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তাঁরা।
ব্যবসায়ীদের দাবি, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত সাজেক পর্যটনকেন্দ্র চালু করতে হবে। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন পর্যটন বন্ধ থাকলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কর্মসংস্থান, স্থানীয় অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮